1 / 350% OFF
Cash on delivery available
ইসলামের ইতিহাসে মিম্বারের ধ্বনি প্রতিটি যুগেই আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দেখিয়েছে আলোর পথ। মানুষ পেয়েছে পথের দিশা। ইসলামের শাশ্বত বাণী এই মিম্বার থেকেই ছড়িয়ে পড়েছে পূর্ব থেকে পশ্চিমে, উত্তর থেকে দক্ষিণে। আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতকে নসীহত প্রদানের এই ধারা নিজ হাতে সাহাবীদের শিক্ষা দিয়েছেন। এরপর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বিস্তৃত হয়েছে মিম্বরের আওয়াজ। ইসলাম একটি ধর্ম নয় শুধু, একটি জীবন আচরণ। ইহলৌকিক ও পারলৌকিক দুটি জীবনের প্রতিটি অনুষঙ্গকে ব্যাখ্যা করে ইসলাম। ঘুম থেকে শুরু করে মৃত্যু, কৈশোর থেকে বার্ধক্য সকল ক্ষেত্রে ইসলাম মানবজীবনকে দেখায় পথনির্দেশ। চলতি পথে হোঁচট খেলে মিম্বরের ধ্বনি পথহারা মুসলিমকে আবারও সঠিক পথ দেখায়। সেই অর্থে মিম্বর মুসলিম সমাজের কন্ঠস্বরের ভূমিকায় রয়েছে। এই কন্ঠস্বর যখন যত বেশি প্রভাব দেখিয়েছে, মুসলিম সমাজও তখন তত বেশি আসমানী আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে। কখনো কোনো যুগে যদি কোনো জালিম শাসক স্বার্থান্বেষী ভূমিকায় এই কন্ঠস্বরকে রোধ করা বা চেপে ধরার কোশেশ করেছে, তখন মুসলিম সমাজ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসলামী বিশ্বে ছেয়ে গেছে অমানিষার ঘোর অন্ধকার। এমন পরিস্থিতিতেও অবশ্য কিছু কিছু মিম্বর স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে ছিল; সময়ের রক্তচক্ষু তাদের কোনোভাবেই প্রভাবিত করতে পারেনি। সামান্য পরিমানেও। পাক-ভারত উপমহাদেশ দুভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার পর ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানে এমন কিছু কন্ঠস্বরের প্রয়োজন ছিল যারা সমকালের চাহিদা পূরণ করে উম্মতকে দিতে পারতেন নতুন দিনের পথরেখা। আল্লাহর রহমতে এমন বেশ কয়েকটি মিম্বরের বাদশাহকে পেয়ে যায় উম্মতে মুসলিমা। মাওলানা আজম তারিক, মাওলানা জিয়াউর রহমান ফারুকী, মাওলানা আব্দুল মজিদ নাদীম তাদের অন্যতম। কিন্ত এদের মাঝেও এমন একটি কন্ঠস্বর মিম্বর থেকে ধ্বনি তোলেন, যার কথামালা উদ্দীপ্ত করেছিল লাখো হৃদয়কে। শীতল করেছে লক্ষ মানুষের আত্মা। মিটিয়েছে উম্মতের জানার চাহিদা। তিনি আর কেউ নন; তিনি মাওলানা মুহাম্মাদ আসলাম শেখোপুরী রহ.। সুদীর্ঘকাল নবীজির রেখে যাওয়া মিম্বর থেকে ইসলামের ধ্বনি উচ্চারণ করেছেন। দেখিয়েছেন হাজারো সমস্যার সমাধান। কালামে পাকের শিক্ষাকে উম্মতের নিকট সাবলীলভাবে তুলে ধরার জন্য তৈরী করেছিলেন বিখ্যাত darsequran.com ওয়েবসাইট। কত মানুষ যে এখান থেকে উপকৃত হয়েছেন। তাঁর সঠিক সংখ্যা কারোই জানা নেই। মিম্বরের ধ্বনিকে উলামায়ে কেরামের কাছে পৌঁছে এক সময় তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ সারনির্যাস রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। ধীরে ধীরে কাজটি বিরাট কলেবর ধারণ করে। সময়ের চাহিদা, উম্মতের মনস্তত্ব, যুগের আহবান সামনে রেখে সেই আলোকে ওয়াহীর জ্ঞানকে ব্যবহার করে রচনা করেছেন অনবদ্য এই রচনা। তাঁর জীবদ্দশাতেই আশাতীত পাঠকপ্রিয়তা পায় এই রচনা। আলিম-উলামা, খতীবানে কেরামের নিকট এটি হয়ে ওঠে একটি অবশ্যপাঠ্য। আর সাধারণ শিক্ষিত মুসলমানরাও অত্যন্ত আন্তরিকভাবে গ্রহন করে নিদায়ে মিম্বার। বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের রুচি ও চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য থাকায় এই অসামান্য গ্রন্থটি অনুবাদ হয়ে আসে বেশ কয়েক বছর আগে। কাজটি আঞ্জাম দিয়েছে মাকতাবাতুল ইত্তিহাদ। মোট আটটি খন্ডে অনূদিত হয়ে এসেছে এই সিরিজ। প্রিয় মাতৃভূমিতেও এই গ্রন্থটি ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। আমরা সেজন্য পাঠকবর্গের সমীপে শুকরিয়া আদায় করছি। স্বাভাবিকভাবেই প্রথম খন্ডে রয়েছে মহান আল্লাহর পরিচয়, তাঁর কুদরত, ক্ষমতার হৃদয়জুড়ানো আলোচনা। এরপরই এসেছে নবীজিকে নিয়ে ধারাবাহিক বয়ান। নবুওয়তের গুরুত্ব ও অবস্থান, নবীজির প্রতি ভালোবাসা উঠে এসেছে অনুপম ভঙ্গিতে। আম্বিয়াদের ওয়ারিশ উলামাদের গুরুত্ব আলোচিত হয়েছে তার পরেই। উম্মাহর মাঝে ঐক্য ফিরিয়ে আনতে দেয়া হয়েছে নানা ধরনের প্রেরণাদায়ক গল্প। এরপরই আলোচিত হয়েছে আত্মশুদ্ধির সবক। একের পর এক অনুষঙ্গ উঠে এসেছে তার কলমে। অবশেষে রয়েছে পরকালের প্রবেশদ্বার মৃত্যুর আলোচনা। দ্বিতীয় খন্ডের শুরুটাও তাওহীদের বাণীতে আলোচিত। নবীজির প্রতি ভালোবাসা, নববি কাফেলার চলার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও উঠে এসেছে এখানে। আরও এসেছে হৃদয়বিদারক কারবালার প্রকৃত ঘটনা। নেয়া হয়েছে শিক্ষা ও উদ্দীপনা। ইসলামী শাসনের প্রধান স্তম্ভ খেলাফত নিয়ে হয়েছে দীর্ঘ আলোচনা। পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনে মুসলমানদের যাবতীয় সুন্নাহ, শিষ্টাচার ও ইসলামী শিক্ষার আলোচনা উঠে এসেছে। সন্তানদের দীক্ষা দেয়ার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ন আলোচনার মাঝে তুলে ধরা হয়েছে ইসলামের নামে ব্যবসা সাজিয়ে বসা ভন্ড পীর-ফকীরদের কারসাজি ও ধোঁকাপূর্ণ কর্মকান্ডগুলো। তৃতীয় খন্ডে আলোচিত হয়েছে নবীদের জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষাসমূহ। আসমানি কিতাব, এর অলৌকিকত্ব ও মানবজীবনে এর প্রভাব নিয়ে হয়েছে বিস্তর আলোচনা। পশ্চিমের সাথে এখানে এসে কিছুটা তুলনামূলক আলোচনা হয়েছে ইসলামী সভ্যতার। পাশাপাশি মুসলিম জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গগুলোর খোলামেলা আলাপ হয়েছে এই খন্ডে। খলীফাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার আলোচনা যেমন এসেছে, তেমনই এসেছে বর্তমান সমাজের ঘূণ হয়ে ওঠা অনৈতিক কার্যকলাপের ফিরিস্তিও। চতুর্থ খন্ডে আমরা দেখি, উলুল আযম নবীদের জীবনের ছটা, সাহাবায়ে কেরামের যাপিত জীবন, কুরআনে বর্ণিত বিশ্বপরিবর্তনের মৌলিক কাঠামোবদ্ধ ছক নিয়ে আলোচনা। এছাড়াও হয়েছে জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ, মুজাহিদের গুণ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিস্তর আলাপ। আল্লাহর আদেশ না মানা জালিমের করুণ পরিণতিও আলোচিত হয়েছে এই খন্ডে। পঞ্চম খন্ডের শুরুটা সাজানো হয়েছে প্রিয় নবীজির অগণিত মূল্যবান উপদেশ নিয়ে। এরপরই রয়েছে নবী ইউসুফের জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষা। আমলের গুরুত্ব ও হযরত আলীর আমলী জীবন নিয়ে হয়েছে তথ্যবহ আলাপ। পরকালীন জীবনের দুটি বড় অনুষঙ্গ জান্নাত ও জাহান্নাম নিয়ে হয়েছে বিস্তর আলোচনা। সমাজের নারীদের আত্মশুদ্ধি নিয়ে লেখক দিয়েছেন বিশেষ কয়েকটি অধ্যায়। অবক্ষয় তৈরীর কারখানাগুলোর নিন্দনীয় দিকসমূহ এবং সমাজকে কলুষমুক্ত করার পদ্ধতি নিয়ে লেখক তুলেছেন আকর্ষণীয় আলোচনা। ষষ্ঠ খন্ডে দেখা যায়, প্রাণপ্রিয় নবীজির জন্মকালীন পবিত্র ও মুবারক আলোচনা, নবুওয়ত থেকে হিজরতের সফরের সুদীর্ঘ আলোচনা শুরুতেই স্থান পেয়েছে। এরপর ধারাবাহিকতার সাথে এগিয়েছে সিরাতের আলোচনা। বদর, উহুদ, খন্দক থেকে শুরু করে একদম বিদায় হজ পর্যন্ত আলোচনা অত্যন্ত ঋজুতার সাথে এগিয়েছে। এরপর নবীজির ইনতিকালের অত্যন্ত হৃদয়বিদারক আলোচনা, সিরাতের নানাদিক ও নানা ধরনের মাত্রা উঠে এসেছে আলোচনায়। সপ্তম খন্ড সময়ের হিসেবে খুবই গুরুত্ববহ। পৃথিবী তার শেষসময়ে এসে বড় বড় ফিতনায় নিপতিত হবে, দাজ্জালী সভ্যতায় মানুষ বন্দী হয়ে পড়বে, এসব তথ্য নববী ইশারায় রয়ে গেছে। শুধু প্রয়োজন এর সঠিক উপস্থাপনা। আলোচ্য খন্ডে যা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভঙ্গিতে উঠে এসেছে। একইসাথে চিন্তার সাথে সম্পৃক্ত সকল ভ্রান্ত মতবাদ নিয়ে তুলনামূলক আলোচনাও হয়েছে এখানে। ফিতনামুক্ত হয়ে আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক কীভাবে আরও প্রগাঢ় হবে, সে নিয়েও দেয়া হয়েছে দিকনির্দেশনা। শেষখন্ডের শুরুটা মুসলিম জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ- উত্তরাধিকার নিয়ে। ভোগবাদী জীবনদর্শনকে ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে এক্ষণে। নারীদের নিরাপত্তার সকল দিক উঠে এসেছে এইপর্যায়ে। আত্মীয়দের অধিকার, বিয়ে-শাদী, সংক্রান্ত আলোচনা প্রাণবন্ত করেছে এই অংশকে। ইসলামী বিচারব্যবস্থা, ফৌজদারি অপরাধ ও সাজা নিয়েও হয়েছে গভীর আলাপ। সবশেষে দাজ্জালী সভ্যতার অন্যতম প্রধান অস্ত্র মিডিয়ার ধোঁকাবাজি, জনতাকে বিভ্রান্ত করার অগণিত কৌশল এবং মিডিয়াকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহারের ব্যাপারে সুনিপুণভাবে দিক-নির্দেশনা দিয়ে শেষ হয়েছে অনবদ্য এই সিরিজটি। আলিম-উলামা ও তলাবাদের জন্য মনে হলেও এই সিরিজটি আপামর জনগণের প্রভূত কল্যাণে আসবে, তা একেবারে নির্দ্বিধায় বলা যায়। একইসাথে মাসালা-মাসায়িল, সিরাত, আত্মশুদ্ধি ও ফিতনার ব্যাপারে সতর্কীকরণ-এতসব বিষয়কে একসাথে এক মলাটে সম্ভবত আর কোথাও পাওয়া যাবে না।